ঢাকা , বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬ , ৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সিপিডির প্রতিবেদন

বাজেটে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত সংস্কারে জোর দেওয়ার পরামর্শ

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ১৭-০৬-২০২৬ ০২:৩১:৪০ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১৭-০৬-২০২৬ ০২:৩৫:৫৩ অপরাহ্ন
বাজেটে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত সংস্কারে জোর দেওয়ার পরামর্শ ছবি : সংগৃহীত
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে ঘিরে বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের ঘোষণা এসেছে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কর ছাড়, বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) ব্যবহারে উৎসাহ এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর মতো পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। তবে সংস্থাটি বলছে, এ খাতের প্রাপ্তি শুধু বরাদ্দের অঙ্ক দিয়ে বিচার করলে হবে না; বরং জ্বালানি নিরাপত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সংস্কারের আলোকে মূল্যায়ন করতে হবে।

বুধবার (১৭ জুন) রাজধানীতে আয়োজিত এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন তুলে ধরে সিপিডি। প্রতিবেদনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বরাদ্দ, ভর্তুকি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো এবং জ্বালানি রূপান্তর-সংক্রান্ত নানা বিষয় বিশদভাবে পর্যালোচনা করা হয়।

ভর্তুকির বোঝা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ

সিপিডির মতে, আগামী অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের ৩৬ হাজার কোটি টাকার তুলনায় কিছুটা বেশি। এই অর্থের বড় অংশ ব্যয় হবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) লোকসান সমন্বয়ে। বিশেষ করে আইপিপি, রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনার কারণে বিপিডিবির আর্থিক চাপ অব্যাহত রয়েছে।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কারণে এলএনজি ও জ্বালানি তেল খাতেও অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। তবে ভর্তুকি কমানোর নামে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে সেই চাপ গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে সিপিডি। তাদের মতে, বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সংকট সমাধানে সক্ষমতা ভাড়া (ক্যাপাসিটি পেমেন্ট) ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা এবং উৎপাদন ব্যয় যৌক্তিক করার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

সৌরবিদ্যুতে বড় প্রণোদনা, কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন

প্রস্তাবিত বাজেটে প্রথমবারের মতো সৌরবিদ্যুৎ খাতের জন্য ২০৩৫ সাল পর্যন্ত শূন্য শতাংশ করহার নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুতের বিল পরিশোধে ৫ শতাংশ কর রেয়াত, সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক কমানো এবং বিভিন্ন যন্ত্রপাতির করভার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সিপিডি বলছে, এসব পদক্ষেপ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। তবে বাজেটের ভেতরের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য প্রকৃত বরাদ্দ এখনও খুবই সীমিত। বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে মোট উন্নয়ন বরাদ্দের প্রায় ৯৮ শতাংশ এখনও জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্পে যাচ্ছে, যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ২ শতাংশ।

সংস্থাটির মতে, সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, বর্তমান বরাদ্দ ও প্রকল্প অনুমোদনের ধারা অব্যাহত থাকলে সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।

ঝুলে আছে একাধিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প

সিপিডির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরে অন্তত ১১টি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প অনুমোদন পায়নি। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ৬৪০ মেগাওয়াট সক্ষমতার সাতটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প, তিনটি গ্রিড আধুনিকায়ন প্রকল্প এবং একটি ব্যাটারি স্টোরেজ প্রকল্প।

সংস্থাটির মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বাড়াতে শুধু বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভর করলে হবে না। সরকারের নিজস্ব উদ্যোগে বৃহৎ আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং উন্নয়ন বাজেটে এ খাতের বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন।

জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতি সুবিধা অব্যাহত

সৌরবিদ্যুতের জন্য কর ছাড়ের ঘোষণা এলেও এলএনজি ও কয়লার ক্ষেত্রে বিদ্যমান আর্থিক সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে সিপিডি। এলএনজি আমদানিতে এখনও ভ্যাট অব্যাহতি এবং তুলনামূলক কম করহার বজায় রয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লা আমদানিতে শুল্ক সুবিধার মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

বাজেট বক্তৃতায় বড়পুকুরিয়া ও দীঘিপাড়া কয়লাক্ষেত্র উন্নয়ন এবং দেশীয় কয়লা উত্তোলন বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। সিপিডির মতে, একদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির কথা বলা হলেও অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানির জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রণোদনা বজায় রাখা জ্বালানি রূপান্তরের লক্ষ্যকে দুর্বল করতে পারে।

গ্রিড আধুনিকায়ন ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্ভব নয়

সিপিডির মতে, বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখন উৎপাদন নয়, বরং সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা। নবায়নযোগ্য জ্বালানি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে হলে বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোকে আরও আধুনিক ও সক্ষম করতে হবে।

কিন্তু বাস্তবে ট্রান্সফরমার, কন্ডাক্টর, টাওয়ার, মিটারসহ গুরুত্বপূর্ণ গ্রিড সরঞ্জামের ওপর এখনও ৬০ থেকে ৯৩ শতাংশ পর্যন্ত করভার বহাল রয়েছে। এতে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে এবং গ্রিড আধুনিকায়নের গতি কমে যাচ্ছে।

সংস্থাটির মতে, এসব যন্ত্রপাতির ওপর কর কমানো হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সঙ্গে জাতীয় গ্রিডের সমন্বয় আরও সহজ হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়বে।

বৈদ্যুতিক যানবাহনে উৎসাহ

জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমাতে এবং পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের জন্য বেশ কিছু কর-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ইভি চার্জিং অবকাঠামো আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহার, বিভিন্ন ধরনের ইভির আমদানি শুল্ক কমানো এবং বার্ষিক আয়কর উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাসের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

অপরদিকে প্রচলিত জ্বালানিচালিত গাড়ির ওপর করহার বাড়ানো হয়েছে। সিপিডির মতে, এই নীতিগত পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়াতে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে সহায়ক হবে।

কৃষিতে সৌর সেচে গুরুত্ব কম

কৃষিখাতে সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বাজেটে প্রত্যাশিত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে মনে করছে সিপিডি। বাজেট বক্তৃতায় মাত্র ৯৮টি সৌরচালিত সেচ পাম্প এবং ২৭টি সৌরচালিত কূপ স্থাপনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

সংস্থাটির মতে, প্রান্তিক কৃষকদের জন্য আলাদা প্রণোদনা, ভর্তুকি কিংবা আর্থিক সহায়তা না থাকায় সৌর সেচ ব্যবস্থার দ্রুত সম্প্রসারণ সম্ভব হবে না। এজন্য লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা প্যাকেজ চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।

বরাদ্দ নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার

সামগ্রিক মূল্যায়নে সিপিডি বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ রয়েছে। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের ক্ষেত্রে কর-সুবিধা ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক। তবে বাস্তবে এখনও জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর প্রকল্পই বেশি সুবিধা পাচ্ছে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও নীতিগত সমর্থন থেকে বঞ্চিত।

সংস্থাটির মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু বরাদ্দ বৃদ্ধির ওপর নয়; বরং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, গ্রিড আধুনিকায়ন, জীবাশ্ম জ্বালানির ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ, সৌর সেচে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা এবং একটি সমন্বিত ‘গ্রিন ফিসকাল পলিসি’ বাস্তবায়নের ওপর। এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশ উভয়ই দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হবে।

বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন
 
 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ